নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ: ভিত্তিটা হোক শৈশবেই

লায়লা খন্দকার পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি ঢাকার এক ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল। দুজন ছাত্র গণিত এবং রোবোটিকস শিখছে আর একজন ছাত্রী ভায়োলিন বাজাচ্ছে।

এই ছবি দেখে শিশুরা কী ধারণা পাবে? তাদের কি মনে হবে না যে সংগীত মেয়েদের জন্য আর গণিত ও রোবোটিকসের মতো বিষয় শুধু ছেলেদের জন্য? কিন্তু বিষয়টা মোটেই তা নয়।

বিজ্ঞাপনটি জেন্ডার স্টেরিওটাইপের একটি দৃষ্টান্ত। জেন্ডার স্টেরিওটাইপ হলো নারী ও পুরুষের বৈশিষ্ট্য এবং সমাজে তাদের ভূমিকা নিয়ে পূর্বনির্ধারিত ধারণা। যেমন সমাজের অনেকে মনে করেন, প্রকৌশল পেশাটা পুরুষদের জন্য আর নারীরা শিক্ষকতায় ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যেকোনো পেশাতেই নারী ও পুরুষ সফল হতে পারে।

জেন্ডার স্টেরিওটাইপের ক্ষতিকর প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের ফসেট সোসাইটি প্রকাশ করেছে ‘কমিশন অন জেন্ডার স্টেরিওটাইপস ইন আর্লি চাইল্ডহুড’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন ‘আনলিমিটেড পটেনশিয়াল’ (ডিসেম্বর ২০২০)।

এতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে জেন্ডার স্টেরিওটাইপ শিশুদের জীবনকে সীমাবদ্ধ করে, মেয়েদের আত্মমর্যাদা কমায়, ছেলেদের মধ্যে পড়ার দক্ষতার ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতে তারা কী ধরনের পেশায় যাবে, সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কমিশন ০-৭ বছর বয়সী শিশুদের ওপর গবেষণা করেছে। কারণ, এই সময়েই পৃথিবীতে নিজেদের অবস্থান নিয়ে তাদের বোঝাপড়ার শুরু হয়।

জেন্ডার স্টেরিওটাইপের ফলে মেয়েরা ছয় বছর বয়সে থেকেই পড়াশোনায় এমন বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়, যাতে তাদের ‘স্মার্ট’ হওয়া প্রয়োজন। সাত থেকে দশ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৬ শতাংশের মতে, চেহারা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এ কারণে তারা নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টিতে ভোগে এবং খাওয়াদাওয়া–সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। পুরুষ উপার্জনকারী এবং যেকোনো পরিস্থিতি শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবে—এই প্রত্যাশাজনিত চাপ পুরুষদের আত্মহত্যার হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এই প্রতিবেদনের ফলাফল বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের জন্যই প্রযোজ্য।

জেন্ডার স্টেরিওটাইপের কারণ

শিশুরা যা পড়ে বা দেখে, যে ধরনের খেলনা দিয়ে খেলে, বড়রা তাদের যা বলে—এসবই জীবন নিয়ে তাদের স্বপ্ন গঠনে ভূমিকা রাখে। পত্রিকা, টেলিভিশন, সিনেমা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির মাধ্যমে নারীদের দুর্বল, পরনির্ভরশীল, সাজগোজ, ঘরকন্নার কাজ এবং অন্যদের যত্নে ব্যস্ত বলে দেখানো হচ্ছে।

পাশাপাশি পুরুষদের চিত্রায়িত করা হয় সবল, দায়িত্বশীল, পেশাগতভাবে সফল হিসেবে। হাতে গোনা ব্যতিক্রম ছাড়া এটাই সাধারণ চিত্র।

মেয়েদের জন্য তেমন খেলনা কম, যাতে তারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতের (‘স্টেম’ হিসেবে পরিচিত) মতো বিষয়ে আগ্রহী হবে। অন্যের যত্ন নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করবে, সেই ধরনের খেলনা সাধারণত ছেলেদের জন্য তৈরি করা হয় না।

পুরোনো রূপকথাগুলোতে মেয়ে চরিত্রগুলো দুর্বল এবং রাজপুত্ররা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের ‘উদ্ধার’ করে।

মানুষ যা দেখে না, তা সে হতেও পারে না। সমাজে প্রচলিত জেন্ডার স্টেরিওটাইপের কারণেই ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের বিজ্ঞানীর ছবি আঁকতে বলা হলে মাত্র ২৫ শতাংশ মেয়ে কোনো নারী বিজ্ঞানীর ছবি আঁকে।

মা-বাবা ও অভিভাবকেরা মেয়ে এবং ছেলেদের আলাদা ধরনের কাজ করতে দেন। মেয়েদের মেধা নয়, বরং ‘রাজকন্যা’র মতো সাজানোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ‘ছেলেরা কাঁদে না’ বলার চর্চা অনেক পরিবারেই আছে।

ছেলে-মেয়েরা কী অর্জন করতে পারে, তা নিয়েও মা-বাবার প্রত্যাশা ভিন্ন।

গবেষণায় জানা যায়, সন্তানের দক্ষতা সম্পর্কে মাত্র ১১ মাস বয়স থেকেই মা-বাবার ধারণা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে শিশুদের খেলার ওপর। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা খেলায় কম অংশগ্রহণ করে; এ বিষয়ে তাদের দক্ষতাও হ্রাস পায়।

মেয়েরা কী করবে অথবা করা উচিত, সেই ব্যাপারে সামাজিক প্রথা মা-বাবা ও শিক্ষকদের প্রভাবিত করে। তাঁদের সনাতন ধ্যানধারণার কারণে মেয়েরা স্টেম বিষয়ে পড়াশোনা এবং পেশায় নিরুৎসাহিত হয়।

জেন্ডার স্টেরিওটাইপের অবসানে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন

সমাজের কোনো একটি অংশ জেন্ডার স্টেরিওটাইপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবে না।

কারণ, সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশে সরকারের উচিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো, যাতে তারা জেন্ডার স্টেরিওটাইপ সম্পর্কে সচেতন হন এবং শিখনপদ্ধতির মাধ্যমে এর মোকাবিলায় কাজ করতে পারেন।

গণমাধ্যমে যাতে জেন্ডার স্টেরিওটাইপ প্রচার করা না হয়, সে বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা দরকার।

ভিডিও ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা, খেলনার নকশাবিদসহ যাঁরাই শিশুদের জন্য কিছু তৈরি করছেন, তাঁদের যে বিষয়গুলো মনে রাখা প্রয়োজন, তা হলো ভিডিও ও ছবির বিষয়বস্তুতে ছেলে এবং মেয়েদের সমানভাবে উপস্থাপন করা; মেয়ে বা ছেলে নয়, শিশুদের জন্য খেলনার নকশা করা।

পরিবর্তনটা শুরু হয়েছে। সাহসী মেয়ে চরিত্র নিয়ে বই লেখা এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে; পুরোনো রূপকথা নতুন করে লেখার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এখানে নারী চরিত্রগুলো সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং অর্থপূর্ণ কাজ করে; তারা পুরুষের বন্ধু ও সহযোদ্ধা। তবে জেন্ডার স্টেরিওটাইপকে চ্যালেঞ্জ করে আরও অনেক গল্প চাই।

শিশুরা অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পরিবার ও সমাজে বারবার বিভিন্ন বার্তা দিয়ে তাদের সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলা কি বিরাট অপচয় নয়? মা-বাবা ও অভিভাবককে শিশুদের জন্য বই, খেলনা, চলচ্চিত্র ইত্যাদি বাছাই করতে হবে খুব সতর্কতার সঙ্গে। মেয়েদের নিষ্ক্রিয় ও তুচ্ছ এবং ছেলেদের সক্রিয় ও সবল হিসেবে তুলে ধরে—এমন কিছু শিশুদের দেওয়া যাবে না।

মা-বাবা যদি সমানতালে ঘরে-বাইরের কাজ করেন, তাহলে শিশুরা নারী ও পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পাবে। শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার সময় খেয়াল রাখবেন যাতে তাদের উৎসাহে ছেলে-মেয়েরা নিজেদের দক্ষতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

ছেলে ও মেয়ে তাদের আগ্রহ অনুযায়ী যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা করবে, পেশা বেছে নেবে এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে—এই পরিবেশটা তৈরি করতে মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজকর্মী, লেখক, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মীসহ সবাইকে নিজস্ব অবস্থান থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার ভিত্তিটা তৈরি হতে হবে শৈশবে।

  • লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *