১৪ ডিসেম্বর: রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন টিটো- মুক্ত হয়েছিল সাভার

সাাভার বার্তা২৪ রিপোর্ট: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এইদিনে সাভারের মাটি পাকিস্তানী হায়েনাদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল। এ দিনেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শহীদ হন গোলাম দস্তগীর টিটো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেটের ঠিক বিপরীতে ফুট ওভার ব্রিজের একদম সাথেই, সাভার ডেইরী ফার্মের ডান পাশে লাল সিরামিক ইটের বাঁধানো একটি সমাধি। সেই শান্তিপূর্ণ সমাধির ওপর দুটি ফুল গাছ, একটি বকুল অপরটি কামিনী। ভিন্ন সৌরভের এই দুটি ফুলগাছ, টিটো’র সমাধি’কে ছায়া দিয়ে গভীর মমতায় আগলে রেখেছে মায়ের আঁচলের মতোই।

লাল ইটের দেওয়ালে শ্বেত পাথরের ফলকে লেখা ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটো’। তাঁর শেষ বিশ্রামের স্থানটিকে রক্ষার জন্য সাভার সেনানিবাস ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ‘টিটোর সমাধিস্থল’ নির্মাণ করে।

শহীদ টিটো’র পবিত্র রক্তের ধারায় স্নাত সাভারের মাটি। একাত্তরের সেই লৌকিক বীরত্বপূর্ণ দিনগুলোর শেষার্ধে এসে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়েছিল সাভার। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ শহীদ গোলাম দস্তগীর টিটো’র লাল রক্তে সাভারের লাল মাটি আরও লাল হয়ে সেদিন সাভার হয়েছিল শত্রুমুক্ত।

মানিকগঞ্জের উত্তর শেওতা গ্রামের তৎকালীন ন্যাপ (মোজাফফর) নেতা গোলাম মোস্তফার ছেলে হলেন টিটো। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। মানিকগঞ্জ এলাকার দুঃসাহসী কিশোর টিটো একাত্তরে দশম শ্রেণীতে পড়তেন। ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ বাঙলাদেশের প্রায় সকলের মতোই শহীদ টিটো’কেও পাকি দানবদের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ নিমিষেই বদলে দিয়েছিলো। পাকি পশুদের একটি দল টিটো র ভাইকে রাইফেলে লাগানো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তার সারা গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মিভুত করে। ওর চোখের সামনে নরঘাতক’রা কয়েক’শ নিরীহ মানুষকে মেরে আগুন দিয়ে পোড়ায়।

প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞায় টিটো, পাকিস্তানি অমানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পথ খুঁজতে থাকে। অবশেষে দুই নম্বর সেকটর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে দেখা হয়। কিংবদন্তী যোদ্ধা ও রণকৌশলী খালেদ মোশাররফ, কিশোর টিটোকে ঢাকা উত্তরের দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন ‘মানিক গ্রুপ’ নামে খ্যাত গেরিলা দলের কাছে অর্পণ করেন।

স্বল্প সময়ের ভেতর কম্যান্ডার বাচ্চু’র (নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু) সাথে টিটোর চমৎকার হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়। টিটোর কেবল একটাই চাওয়া, সে যুদ্ধ করবে, তাকে যুদ্ধের ট্রেনিং দিতে হবে। বাচ্চু ভাবেন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরকে যুদ্ধে জড়ানো ঠিক হবে না। টিটোকে বোঝানোর জন্য বলেন, ‘তুমিতো এতো ছোট কেমন করে যুদ্ধ করবে? টিটো সর্বশক্তি নিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘আমি ওদের সবাইরে মাইরা ফালামু, ওরা আমার ভাইরে মারছে। আমি ওদের আগুনে পুইড়া ছাই বানামু । ওরা আমার গ্রাম পুইড়া ছাই বানাইছে। সব কয়টারে গুলি করে মাইরা প্রতিশোধ নিমু!’

বাচ্চু, এতটুকু কিশোরের প্রতিশোধ স্পৃহা দেখে জিজ্ঞেস করেন- টিটো স্বাধীনতা কি বুঝ তুমি? টিটো বলে, ‘হ’ জানি! সবাই কয় দেশ স্বাধীন হইলে সবাই নাকি সুখে থাকবো। দ্যাশ থিক্যা অশান্তি দুর হইবো। আমি স্বাধীনতা দেখমু। আমি যুদ্ধ করুম।’

টিটো’কে তাঁর মন রক্ষার্থে কিছু অস্ত্র ব্যবহার শেখানো হলো কিন্তু বয়সে ছোট থাকায় তাকে সরাসরি যুদ্ধের সুযোগ দেওয়া হলো না। কিন্তু তাঁর মাঝে অদম্য ইচ্ছে সে যুদ্ধ করবেই। তাকে বোঝানো হলো যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করাটাও যুদ্ধ। তাঁকে সে দায়িত্বটা দেওয়া হল। কয়েক দিনের মধ্যেই সে সবার প্রিয় টিটো হয়ে উঠলো।

নভেম্বরের শেষ দিকে ঢাকা সাভার আরিচা সড়কের দুই পাশ দখলে আসে ঢাকা উত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাভার থানাও ঘেরাও করেন মুক্তিযোদ্ধারা। একই সময় একদল পাকিস্তানি হার্মাদ দল ঢাকার পথে ফিরছিলো। এরা এসে সাভার থানার পাকিস্থানী সেনাদের সাথে যোগ দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। সাথে সাথে বাচ্চু ওদের প্রতিরোধে নেমে পড়লেন।

১৪ই ডিসেম্বরের ভোরে, বর্তমান আশুলিয়া থানার জিরাবো এলাকার ঘোষবাগে চার’শ মুক্তিযোদ্ধা’কে কম্যান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু রণকৌশল বলে দিয়ে মাত্র ৫০ জনকে জরুরী অবস্থা মোকাবেলায় রেখে, বাকী অন্যদের চার ভাগে ভাগ করে দেন। এই ৫০ জনের দলে পড়ে টিটু, সে এটা মানতে পারেনা। টিটো কান্নায় ভেঙে বাচ্চুকে বলতে থাকেন, ‘যুদ্ধে আমারে নিয়া যান’। আমিও যুদ্ধ করুম’।

বাচ্চু গভীর আবেগে টিটোকে আদর করে বললেন, ‘এই যুদ্ধে আমরা অনেকে নাও ফিরতে পারি। তুমি থাকো।’ টিটো কেঁদে বলে, ‘আপনারা সব মইরা যাইবেন আর আমি বাইচা থাকমু ক্যান? আমিও মরুম। বাচ্চু টিটোকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘টিটো তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। তুমি না স্বাধীনতা দেখতে চাও?

যুদ্ধ শুরু হলো। তুমুল লড়াই। কিন্তু হেভী মেশিনগানটিকে ধ্বংস করতে না পারলে এ যুদ্ধে পাকি’দের হারানো যাবে না। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে কম্যান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু সহযোদ্ধা আরিফকে নির্দেশ করলেন- সে যেন দৌঁড়ে ২ নম্বার দলের যোদ্ধা নুরুকে বলে- যেভাবেই হোক ঐ হেভী মেশিন গানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। আরিফ লিডারের নির্দেশ মতো না গিয়ে, কিশোর টিটো’কে নির্দেশ দিলো। যার রক্তে প্রিয়জন হারানোর প্রতিশোধ স্পৃহা ও যার চোখে এক শোষণ মুক্ত স্বাধীনতার স্বপ্ন সেই টিটো’কে আর কে পায়।

নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে নিজেকে কাভারে না রেখে লাফ দিয়ে উঠে। কোন আড়াল ছাড়া মুক্তি পাগল কিশোর টিটো, সোজা নুরুকে লক্ষ্য করে দৌঁড়াতে লাগল আর চিৎকার করে নুরুকে বলছিলো লিডারের নির্দেশ। ঠিক তখনই সেই হেভি মেশিনগানের এক ঝাঁক বুলেট এসে বিদ্ধ করে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কিশোর টিটো’র বুকে। বুলেটের আঘাতে মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে উঠে, মাটিতে পড়ে টিটোর দেহ। মেশিনগানের বুলেট ঝাঁঝরা করেছে টিটোর বুক। টিটো চিৎকার বাচ্চু ভাইকে ডাকে, ‘বাচ্চু ভাই আমারে বাঁচান।’

মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রিয় টিটো’র রক্তাক্ত দেহ দেখে শোক’কে মহাশক্তিতে পরিনত করে এক শ্বাসরুদ্ধকর যুদ্ধের মাধ্যমে পাকি হায়েনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।

সেদিন রনাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সবার মুখে একই প্রশ্ন ছিল, ‘টিটো বেঁচে আছে কি?’ হ্যাঁ, টিটো তখনো বেঁচে আছে। কাঁতর কণ্ঠে বলেছিল- ‘আমারে বাঁচান! আমি স্বাধীনতা দেখুম। স্বাধীনতা দেইখা মরুম। আমারে বাঁচান।’

টিটো’র রক্তে ভেসেছিল সেদিন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের মাটি। বাঙলার মাটি পবিত্র হলো আরেক সন্তানের তাজা বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে টিটো। তাঁর পাশে অসহায় সব সহযোদ্ধারা। সবার চোখে অশ্রুর বন্যা। টিটো বার বার বলতে থাকে তার খুব ব্যথা করছে। খুব শীত লাগছে।

সহযোদ্ধারা একে একে ২০ টি কম্বল দিয়ে ঢেকেও শেষ রক্ষা করতে পারছে না। টিটো’র কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। এখন ওর শুধু ঠোঁট কাঁপছে। এক সময় তাও বন্ধ হয়ে গেল। টিটো এখন সকল যন্ত্রণার উর্দ্বে চলে গেছে। মৃত্যুর সময় হয়তো বিড় বিড় করে বলে গেছে, ‘আমি তো স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলাম না!

ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে, টিটো শুয়ে আছে চিরনিদ্রায়। আপনি কি যাবেন একটিবারের জন্য ? টিটো শুয়ে আছে চির শান্তির ঘুমে, যেখানে দুটি ফুল গাছ, একটি বকুল অন্যটি কামিনী। ভিন্ন সৌরভের এই দুটি ফুলগাছ, টিটো’র কবরটিকে ছায়া দিয়ে গভীর মমতায় আগলে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *