সময় বয়ে যায় কিন্তু স্মৃতি রয়ে যায়

বরুন ভৌমিক নয়ন

দপ্তর সম্পাদক, বিএফইউজে- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

পর্ব-১
বিগত ১৯৯১ সালে জামায়েত ইসলামের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনের পরেই,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারী করা হয় “ধরা পড়িলেই কেন্দ্রীয় কারাগারে ১২০ দিনের আটকাদেশ” হুলিয়া মাথায় নিয়ে পলাতক জীবনের সেই কষ্টের দিনাতিপাতের এক সন্ধিক্ষণে ঢাকার খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে আমার সাথে দেখা হয় অনেক কৃষিবিদ সহ প্রিয় আপাদমস্তক কৃষিবিদ সমীর দার সাথেও। পরিচয় করিয়ে দেয় পূর্ব পরিচিত কৃষিবিদ আমিনুল ভাই। শুরু হয় সম্পর্কে দিকে, যা আন্তরিকতার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে যায়। আমার সাথে পলাতক জীবনে সাভারের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ নেতা তাপস চক্রবর্তী আর স্নেহের ভাগ্নে, সে সময়কার ছাত্রলীগ নেতা আজকের সাভার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব। ওদের মাথায় একই হুলিয়া।

পর্ব- ২
সেনাশাসক হুসেইন মোহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ পরবর্তী ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদের নির্বাচন পরবর্তী জামাত সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে।
ঢাকা -১২ (সাভার) আসনে একেবারেই অপরিচিত বিএনপির প্রার্থীতা নিয়ে আসেন নিয়ামত উল্লাহ সাবু তার সাথে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হলেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অনেক পরিচিত সামছুদ্দোহা খান মজলিস। ফলাফল ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয় নৌকা প্রতীকের।
যাই হোক, জামাত সমর্থনে বেগম খালেদা জিয়া ঐ সালের ২০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন।

আমাকে মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক স্ত্রী ২ শিশু সন্তান আর মা সহ তখন (নিতান্তই একেবারেই শিশু বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে) সাভার সরকারি ডেইরী ফার্ম সরকারি বাসস্থানে বসবাস করতে হয়। সে তখন ওখানকার মেডিকেল সাব সেন্টারে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত। আমার প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে শহরে যেতে হয়।সেদিন সপ্তাহের ছুটিতে আমি সাভার পুরাতন বাজারের মিস্টি পট্টিতে বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডায়, রাত ৮টার মতো হবে। এমন সময় (তখনকার সাভার থানার ওসি আতাউর রহমান ভাই।আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ)ওসি সাহেবের বডিগার্ড মোঃ হোসেন আমাকে বাইরে আসতে বলে,এবং দেরি করতে না বলে,আমি উনার কথার গুরুত্ব বুঝে দ্রুত বাইরে আসি। কনষ্টেবল হোসেন ভাই আমাকে বলে স্যার বলছে আপনাকে দ্রুত ফোনে কথা বলতে এবং তাড়াতাড়ি সাভার ত্যাগ করতে।

আমি অবাক এবং বিস্ময় হয়ে কাছের এক দোকান থেকে টকটক এক্সচেঞ্জ মাধ্যমে ফোন দেই ওসি সাহেবকে। বলে, “তাপস আর রাজীব কে? আপনার কাছের কেউ হবে, তাই ওদের নিয়ে তাড়াতাড়ি সাভার থেকে ভাগেন ” আমি বললাম ভাই,আমার নামে তো জিডি, মামলা কিছুই নেই… উত্তরে বললেন,” ধুর মিয়া আমি তো জানিই,আপনার নামে ও ওদের নামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিরাট আটকাদেশ এসেছে. ভাগেন জলদি…

আমি দ্রুত উত্তরপাড়ার আওয়ামী লীগ নেতা ছোট ভাই তাপসকে আর আমরা দুজনে মিলে কাছেই রাজীবদের বাড়ি যেয়ে ওকে পেয়ে গেলাম।জানালাম। শুনে বললো, মামা, আমি ভাগলাম, আমার সাথে চলেন নাইলে আপ্নেগো মতো ভাগেন।আমার কথা চিন্তা কইরেন না। পরে ঢাকায় একটা ব্যবস্থা করা যাইব নে..

পড়ি কী মরি রাজীবকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে আমি আর তাপস গোপনে (সাভার শহর এলাকায় তেমনি কোন জনবসতি নেই)হেটে তালবাগস্থ আমার বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক পৌর কমিশনার মোঃ হোসেন আলীর বাড়িতে যাই।ঘটনা খুলে বলি। হোসেন খুব দ্রুত আমাদের দুইজনকে তার মটর সাইকেল দিয়ে গাবতলী ব্রীজের নীচে একটা রেষ্টুরেন্টে ভাত খাওয়ায়ে কিছু নগদ টাকা হাতে দিয়ে বললো, কোথায় থাকবি আমারে জানাইছ…

আমি আর তাপস কোথায় কার কাছে যাবো ভেবে পাচ্ছি না। রাতও অনেক হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি হালকা শীত। শেষে, গাড়ি না পাবার শর্তে দুজনে চাদরে মুখ ঢেকে গাবতলী প্রায় জনশূন্য টার্মিনালে রাত কাটিয়ে দিবার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাজীবের কথা খুব মনে হচ্ছিলো…

পর্ব- ৩

গাবতলী বাস টার্মিনালে ভয়ে ভয়ে রাতটুকু শেষ হতে তাপসকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই, এই রকম বিপদকালীন সময় কার কাছে যেয়ে বিশ্বাস আর আশ্রয়ের জায়গাটা পাই। থানার ওসি সাহেব তো বলেই দিয়েছে ” সামনে পড়লে কিন্তু চৌদ্দ শিকে”।
হঠাৎ দুজনেই একমত হলাম ঢাকার ধানমন্ডির বাসায় ফিরোজ ভাইয়ের বাসায় যাই এবং সবকিছু খুলে বলি আর পকেটের অবস্থাও “নট ইজ টু ফটিস”।
অনেকটা ফাঁকা রাস্তা থেকে রিকশা ঠিক করলাম, ধানমণ্ডি ১৯ এ যাবো। ২০টাকা হাকিয়ে বসলে দেনদরবার করে ১৫ টাকায় রাজি করলাম। খুব সকালে ফিরোজ ভাইয়ের বাসায় হাজির হলাম। বাসার দোতলায় ভাবীসহ থাকতেন। বাড়ির দাড়োয়ান আমাদের দেখে হকচকিয়ে স্বল্প স্বরে বলে “আপনারা, আমি বললাম ভাই কই? বললো ঘুমিয়ে আছেন।
তাকে তাড়াতাড়ি কলিং বেল দিতে বলি। কয়েকবার কলিং বেল দেবার পরে ঘুমঘুম চোখে ফিরোজ ভাই নেমে এলেন। অবাক হয়ে বিস্তারিত শুনলেন, লুংগি-গামছা এগিয়ে দিয়ে বললেন, আগে গোসল-নাস্তা করো তারপর দেখছি। আশ্বস্ত হলাম।

দুপুরের দিকে ফিরোজ ভাই ওসি সাহেবকে ফোন দিলো। কথোপকথনে বুঝলাম ওসি সাহেব আগামীকাল নিউ মার্কেটের ভিতরে আমিসহ যেতে বলেছেন। যাই হোক দিনরাত আর ফুরাতে চায় না। যথেষ্ট আদরযত্ন কাটিয়ে ফিরোজ ভাইয়ের গাড়িতে আমি আর তাপসসহ চললাম নিউ মার্কেটে।

দুপুর গড়াতেই দেখি ওসি আতাউর ভাই সস্ত্রীক (শ্রদ্ধেয় ভাবী, আমাকে ভালো চিনতো) হাজির। আমাকে দেখে ফিরোজ ভাইকে বললেন, কী আসামী সাহেব তো ভালো বিপদে পড়েছে। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেখালেন। সরকারের সন্তুষ্টির সাপেক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত “উক্ত ব্যক্তিদের জন্য সরকার তথা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হতে পারে তাই নিরাপত্তার কারণে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী ১২০ দিনের আটকাদেশ প্রদান করা হইলো। যা ধরা পরার দিন থেকে কার্যকর হইবে” মেমো নং- ০৩২৩-স-ন(নিরা-১) তারিখ ০৯-১০-১৯৯১। বিঃদ্রঃ -ভবিষ্যতে কেউ বেনামি দরখাস্ত দিলে সুবিধা করে দিলাম। খালি মেমো নাম্বারের ক্ষেত্রে প্রথম ০ এর জায়গায় অন্য সংখ্যা খোঁজে নিতে একটু কষ্ট করতে হবে এই যা…আর সব ঠিক আছে।

তাপসকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ফিরোজ ভাই। আতাউর ভাই, মুচকি হেসে দিলেন,
যাক থাকেন, সাবধানে থাকবেন। পুলিশের নজরের বাইরে…….. ইত্যাদি।

যাহোক সে আরো অনেক কথা, কিন্তু আমাদের সাথে আরেকজনের নাম দেখলাম, তার নাম জাকির হোসেন নুহু। আমি ওসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই, নুহুরে তো বলা হয়নি ও তো আমার ছোট ভাই তথা তাপস-মানিকদের (মানিক মোল্লা বর্তমানে সাভার পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) বন্ধু। উনি বললেন, সে গতকাল বাসা থেকে গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতের পথে। শুনে মনটা সবার খারাপ হয়ে গেলো। সাভারের ঘোষপাড়ার সেই প্রিয় নুহু কয়েক বছর আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পরপারে চলে গেছে। আমি সবসময়ই ওর আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করি। নুহু প্রিয় ছোট ভাই, আমি জানলে তোমাকেও সাথে করে নিয়ে আসতাম…অযথা অনেকদিন জেলে থেকে অসহনীয় কষ্ট করেছো, পারলে ক্ষমা করে দিয়ো…চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *