শিশু নির্যাতনকারী অধ‍্যাপকের সঙ্গে কথপোকথন এবং হরেক রকমের পুলিশ

মঞ্জুরুল আলম পান্না:

ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় তিনশো কিলোমিটার পথ কাজের শিশু মেয়েটিকে দাঁড় করিয়ে আনা ওই মহিলার নাম অধ‍্যাপক নাসরিন সুলতানা। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ‍্যাপক। সামন্তবাদী চরিত্রের ওই মহিলা তার দুই সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার সেন্টমার্টিন পরিবহনে সিটের ওপর পা তুলে ৮ টি ঘন্টা পার করলেও কাজের মেয়েটিকে ওভাবেই আসতে হল। ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে কুৎসিত এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা যায়। বিষয়টি ফেসবুকে তুলে ধরলে বন্ধুবর পুলিশ কর্মকর্তা Shymal Mukherjee নিজেই পরামর্শ দিলেন ৯৯৯-এ ফোন দিতে। সেখান থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হলেও তারা পুলিশের যশোর কন্ট্রোল রুমে জানাতে বলেন। কন্ট্রোল রুমের নাম্বারও তারা এসএমএস করল। কন্ট্রোল রুমে ফোন দিলে যে এসআই ফোন ধরলেন তাঁকে খুব অসহ‍্য মনে হচ্ছিল। আমার অভিযোগ শুনে তিনি যেভাবে কথা বলছিলেন তাতে মনে হল এটা কোন বিষয়ই নয়।

প্রথমে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, কোন সীট খালি থাকলে মেয়েটাকে বসিয়ে দেন। বললাম- সেটাতো আমরা নিজেরাই পারি। এর জন‍্য আপনাকে ফোন দেব কেন। বাসের মধ‍্যে যা ঘটছে, তাতো প্রকাশ‍্যে শিশু নির্যাতন। আপনাদেরতো উচিত আইনের প্রয়োগ ঘটানো। -এখানে পুলিশ কী করবে? আচ্ছা, সুপারভাইজারকে দেন। আমি বলে দিচ্ছি।
-আপনি কি ঘটনাটার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন?
-ওইতো বুঝছি। কাজের মেয়েকে বসতে দেয়নি। তা, আপনারা সবাই মিলে প্রতিবাদ করেন না….
আমার যেটুকু বোঝার বুঝে ফোন কেটে দিলাম। আবার ফোন দেই ৯৯৯-এ। এবার অন‍্য কেউ ফোন ধরলে তিনিও বিষয়টিতে সমান গুরুত্ব দিয়ে যশোর কন্ট্রোল রুমের ফোন নাম্বার দিতে চাইলেন, কারণ আমাদের গাড়িটির পরবর্তী স্টেশন যশোর। বললাম, ভাই ওখানে কথা বলে কোন লাভ নেই। সব শুনে তিনি অন‍্য একজনের সঙ্গে পরামর্শ করে এবার দিলেন একটি জাতীয় নাম্বার ৩৩৩, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক বিশেষ অভিযোগ জানানো যায়। গাড়ি ততোক্ষণে যশোরের কাছাকাছি। ওই নাম্বারে ফোন দিতে দিতেই সুপারভাইজারের কাছে জানতে পারলাম ওই অধ‍্যাপক মহিলা যশোর নিউমার্কেট এলাকাতেই নামবে।

আইনগতভাবে কিছু করার সুযোগ না পেয়ে নিজেই গেলাম ওই মহিলার কাছে।
Excuse me. একটু কথা বলতে পারি?
-হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ। বলুন।
-আপনি কি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন।
খুব মিষ্টি করে বললেন, জ্বী।
-কোন বিভাগে?
-সরকার ও রাজনীতি বিভাগে।
-ও আচ্ছা। কিন্তু ৭/৮ বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে যে এতোটা পথ দাঁড় করিয়ে আনলেন, এটা কি ঠিক হয়েছে? ওর জন‍্য কি একটা আলাদা সিটের ব‍্যবস্থা করা গেল না?
একটু থতমত হয়ে তিনি বললেন, আপনি আসলে ভুল বুঝছেন। ওর আসলে করোনা সিম্পটম আছে। তাই ওকে অন‍্য কোথাও দিতে চাইনি।
-বাহ্!! করোনার লক্ষণ আছে, তাই আলাদা সিট দিলেন না, এটা কোন যুক্তি হল? ওর অসুস্থতার জন‍্যতো তাহলে ডাবল সিটেরই ব‍্যবস্থা করা দরকার ছিল। তা না করে মাত্র কটা টাকার জন‍্য শতশত কিলোমিটার পথ এভাবে দাঁড় করিয়ে আনলেন? এটা কি পুরোপুরি একটা অমানবিক কাজ নয়? আপনিতো রীতিমতো শিশু নির্যাতন করছেন। শিক্ষিত ভদ্রমানুষের লেবাস ধরে এ ধরণের মানসিতায় লজ্জা হয় না আপনার? ছিঃ….
তিনি বললেন, আপনি একটু বেশিই বলছেন। আমি কিন্তু ওকে নিজের সন্তানের মতোই দেখি।
-আপনার দুই সন্তানতো দুই পা তুলে চিপস-পপকর্ণ খেতে খেতে যাচ্ছে। নিজেও যাচ্ছেন সিটের ওপর পা তুলে। মেয়েটাকে দিয়েছেন এক টুকরো চিপস?
তিনি আবারও বললেন, আমি না কি বেশি বেশি বলছি। সঙ্গে তার চোখ রাঙানী। আরও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ‍্য করলাম বাসের অন‍্য যাত্রীরা হিন্দি সিনেমার নিরব দর্শক হয়ে আছেন।

লেখক: সাংবাদিক, সাবেক সিনিয়র রির্পোটার, এসএ টেলিভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *