বাবা আমি যেন তোমার আদর্শে গড়ে উঠে তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি

রাহাত মুবাশ্বির: প্রতিটি সন্তানের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব, আমার বাবাও তেমনই প্রিয় ব্যক্তিত্ব আমার কাছে। অন্যদের তুলনায় ভিন্নতা এতটুকু বলবো আমার বাবা যখন অন্যদের কাছেও প্রিয় ব্যক্তিত্ব বলে জানতে পারি তখন আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠে। একজন সৎ, আদর্শবান ও সর্ববিষয়ে পারদর্শী মানুষেরাই হতে পারেন একাধিক জনের কাছে প্রিয় ব্যক্তি বলে আমি মনেকরি।
আমার বাবা বিপিএটিসি স্কুলের সাবেক সিনিয়র শিক্ষক (গনিত) মরহুম এ বি এম মোয়াজ্জেম হোসেন। আজ বাবা নেই। তিনি গত ২০ অক্টোবর’২০ ইং ভোর রাতে ইন্তেকাল করেন। বাবার স্মৃতি ভেসে আসছে তার কর্ম ও দক্ষতার। একদিকে বাবা হারানোর বেদনা অপরদিকে বাবার বিভিন্নকর্ম স্মৃতিতে বুকটা গর্বে ভরে উঠছে।

‘একবার বিপিএটিসি স্কুল থেকে একটি যৌক্তিক কারনে একজন শিক্ষার্থীকে টিসি দেয়া হয়। তারপর রাতে তার কাছে ফোন আসে। ফোনের ওইপাশ থেকে বলা হয় মোয়াজ্জেম সাহেব আপনি তো সাভারেই থাকেন। আপনার তো একটি ছেলেও আছে। মনে ভয় নাই? আমি আমার বাবার পাশে বসা তখন। বাবার দিকে তাকিয়ে আছি। দেখি তিনি মুচকি হাসলেন আর জবাব দিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন কে জিন্দা জ্বালিয়ে দিলেও মোয়াজ্জেম হোসেন এর মনে বিন্দুমাত্র ভয় তোমরা তৈরী করতে পারবে না। মোয়াজ্জেম হোসেন এর মাথা যদি কারো সামনে ঝ্ুঁকে থাকে তাইলে সেটা শুধুই আল্লাহর কাছে। আর কারো সামনে কখনোই না।’ সেই নির্ভিক মানুষটিই আমার বাবা। তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের আমি দেখেছি বাবাকে পাগলের মত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসতেন।

আমার বাবা এ বি এম মোয়াজ্জেম হোসেন সাভারের বিপিএটিসি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৮৬ সালে। এর আগে তিনি বরিশাল এর বাদলপাড়া স্কুলে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিনি অল্প কিছুদিন ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে দেশে ও দেশের বাইরে আমেরিকা, কানাডা থাকা তার সাবেক ছাত্ররা ফোন দিয়ে যখন তাদের অনুভূতির কথাগুলো আমাকে বলছেন তখন বাবাকে নিয়ে আমার গর্ববোধ হয়। তাদের সবাই ক্রন্দনরত অবস্থায় আমাকে বললেন পিতাকে শুধু তুমি হারালে না, পিতাকে আমরাও হারালাম।

বাবার লাশ নিয়ে যখন গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকিতে গ্রামে প্রবেশ করি তখন বাজে রাত প্রায় সাড়ে ১০ টা। সেই সময়ও শত শত মানুষ আসে তাকে বিদায় জানাতে। লোকজনে একাকার হয়ে যায় আমাদের গ্রাম। চেয়্যারম্যান থেকে শুরু করে ঢাকা থেকেও শত শত মানুষ ছুটে যায় তাকে শেষ বিদায় জানাতে। সেই সময় আমি দেখেছি তার সমবয়সী বন্ধু যারা ছিলো তারা বাদেও যারা তাকে দেখেনি শুধু বাপ দাদাদের কাছ থেকে তার কথা শুনেছে তারা কি পরিমাণ কেঁদেছে।

আমার বাবা ছিলেন সাহসী মানুষ। একজন শিক্ষক। একজন অভিভাবক। একজন অনুপ্রেরণার মানুষ। একজন সফল মানুষ। যিনি শত বাধা উপেক্ষা করে, মানুষের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করে লজিং থেকে শত শত মানুষের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। তাকে দেখে প্রতিনিয়তই শিখতাম।

আল্লাহর প্রতি ছিলো অগাধ বিশ্বাস। মৃত্যু শেষ কয়দিন তিনি কিছুই খেতে পারেননি। মৃত্যুর আগের দিন তাকে আমি জোর করে এক চামচ ভাত খাইয়েছিলাম। এটিই ছিলো তার শেষ খাওয়া। তাকে খাওয়া নিয়ে জোর করলে তিনি জবাব দিতেন আল্লাহ আমার রিজিক কমিয়েছেন আবার তিনিই বৃদ্ধি করবেন।আব্বুকে যখন বলতাম আব্বু না খেলে ওষুধ খাবে কিভাবে? আর ওষুধ না খেলে সুস্থ হবে কিভাবে? তিনি উত্তর দিতেন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া আমি এক সেকেন্ড আগেও যাবো না।আমাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, একথা বলেই তিনি মুচকি হাসি দিতেন। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তিনি যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন তখনও তিনি আমার মাকে বলছিলেন রাহাতের আম্মু, আমি নামাজ পড়বো।

গত ৩০ অক্টোবর বিকেলে দোয়া মাহফিল ও স্মরণ সভায় উপস্থিত বাবার সহকর্মী শিক্ষক, সাবেক ছাত্র-ছাত্রী ও মুরুব্বীদের আলোচনায় বাবার কর্মজীবনের অনেক কথাও জেনেছি। তারা বলেছেন বিপিএটিসি স্কুলের এর প্রতিটি ইট, ঘাস,লতাপাতা জানে আমার বাবা কতটা শ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকে সাভারের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছিলেন। তার অশ্রু, ঘাম বৃথা যায়নি। শত শত ছাত্রের হৃদয়ে তিনি ঠিকই স্থান করে নিয়েছিলেন এবং থাকবেন।

কর্মজীবনের শেষ সময়ে তার কিছু ক্ষোভ ছিলো। কারন কলেজ করার পর একসময় যারা চাকরির জন্যে দিনের পর দিন আমাদের বাসায় এসে বসে থাকতো, যাদের কর্মজীবনে আমার বাবার সবচেয়ে বেশি অবদান তারাই পিছনে পিছনে তার নামে মিথ্যা অপবাদ দিতো। কারন তারা জানতো তাকে সরালে তাদের অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করার কেউ থাকবে না। সেই বেঈমানীর কারনে তিনি দুঃখ পান। সেই রাগ আর ক্ষোভ থেকে তিনি ২০১৬ সালে অবসর গ্রহনের পর আর কোনদিনও বিপিএটিসি তে যান নাই।
যারা তার বিরুদ্ধে কথা বলতো তারা নিজেরাও জানতো যে, তারা যা করছে তা ভুল। কিন্তু শুধুমাত্র তেল দিয়ে উপরে উঠার জন্য এই জঘন্য কাজ তারা করেছিলো। সেই বেঈমানদের কাছেও যদি এই মহান শিক্ষক সম্পর্কে এক লাইনে জানতে চাওয়া হয় তাহলে তারাও বলতে পারবে না তিনি ভালো মানুষ ছিলেন না।

ভাবতে অবাকই লাগে যে, মানুষ কিভাবে ভুলে যায় তার অতীতের কথা। যিনি না থাকলে তাদের চাকরিই হতো না, যিনি ছিলেন তাদের মাথার উপরে ছায়ার মতো, সেই তার মত ব্যক্তিকে নিয়ে কথা বলতে কি বেঈমানদের হৃদয় একটুও কাপলো না? অনেক দুঃখ নিয়ে কথাগুলো লিখলাম। সত্য অমানুষদের কাছে সবসময় অপ্রিয় হয়। তাদের কাছেও কথাগুলো ভালো লাগবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আর সহ্য করতে না পেরে, বাবার শেষ জীবনে অমানুষদের কাছ থেকে অমানুষিক কষ্ট পাওয়ার কথাগুলো তাই বলতে বাধ্য হলাম।

বাবা তুমি দোয়া রেখো তোমার রাহাত যেন তোমার স্বপ্নগুলো পূরন করতে পারে।

  • আম্মুর কাছে রেখে যাওয়া আব্বুর রাহাত।
  • মোবাইল: ০১৭৭৯৫১১১৩২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *