দিনাজপুরের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের যেভাবে উপর হামলা হয়

ডেস্ক প্রতিবেদন: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে ঢুকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের (৩৫) ওপর হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বাড়ির টয়লেটের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে শোবার ঘরে গিয়ে ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে তাঁর শরীরে আঘাত করা হয়। বাধা দিতে গেলে ওয়াহিদার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকেও (৬৫) হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হামলাকারীরা।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ চত্বরের বাসায় এই হামলার পর ওয়াহিদাকে দিনাজপুর ও রংপুরে চিকিৎসা দেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকায় আনা হয়। শেরেবাংলানগরের সরকারি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তির পর রাতেই তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। রাত ১১টা ৫ মিনিটের দিকে তাঁর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার শেষে তাঁকে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আগের চেয়ে তাঁর অবস্থা কিছুটা উন্নতি বলা যায়। তবে তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। হাতুড়ির আঘাতে তাঁর মাথায় দেড় ইঞ্চি পরিমাণ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে হাড় ব্রেনে ঢুকে গিয়েছিল।

ওয়াহিদার বাবা ওমর আলী শেখের আঘাত গুরুতর নয়। বাসায় ইউএনওর সঙ্গে তাঁর চার বছরের একমাত্র সন্তান আদিয়াত হাসান ছিল, তার ওপর হামলা চালায়নি দুর্বৃত্তরা। ওয়াহিদার স্বামী মেজবাউল হোসেনও ইউএনও; তিনি রংপুরের পীরগঞ্জে কর্মরত এবং সেখানেই থাকেন।

বাবা ওমর আলীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য মতে, তিনি বাসায় একজন মুখোশধারী ব্যক্তিকে দেখেন। ওই মুখোশধারী তাঁর মেয়ের (ওয়াহিদা) কাছে চাবি, টাকা ও স্বর্ণালংকার চাইছিল। মেয়ের চিৎকার শুনে তিনি এগিয়ে গেলে তাঁর ওপর হামলা চালায়।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বাসা থেকে কিছুই খোয়া যায়নি। উদ্ধার করা যায়নি হামলায় ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্র। শুধু ডাকাতির উদ্দেশ্য নয়, কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। গতকাল দুপুরে বাসভবনের নৈশপ্রহরী পলাশকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে দিনাজপুরের গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা পরিষদ পুরোটাই সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। ইউএনও ভবনের ক্যামেরায় ভবনটির পশ্চিম দিকের দোতলার টয়লেটের ভেন্টিলেটর দিয়ে পিপিই ও মাস্ক পরা দুজনকে ভেতরে ঢুুকতে দেখা গেছে। ওয়াহিদার চিৎকারে লোকজন জড়ো হলে তাদের একজন নিচতলা দিয়ে বের হয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। অন্য ব্যক্তি কিভাবে গেল তা গতকাল বিকেল পর্যন্ত সিসি ক্যামেরা সূত্রে শনাক্ত করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাসা থেকে ইউএনওর ল্যাপটপটি খোয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যক্তিগত বা পেশাগত আক্রোশ, লুট করার উদ্দেশ্য ও উগ্রপন্থীদের সন্দেহ করেই তদন্ত করা হচ্ছে। ইউএনও ওয়াহিদা করোতোয়া নদীতে উচ্ছেদ এবং অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন। ঘোড়াঘাট উপজেলায় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের অপতৎপরতা রয়েছে। এ বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলছেন, ঘোড়াঘাটের ইউএনওর ওপর কারা হামলা চালিয়েছে, তা খুব দ্রুতই জানা যাবে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউএনওর ওপর হামলাকারী দুই দুর্বৃত্তের মুখে মুখোশ ছিল এবং সেগুলো দেখে পর্যালোচনা চলছে। সেখানে হাই পাওয়ার্ড টিম কাজ করছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শত্রুতাবশত মনে করলে তিনি একা আক্রান্ত হতেন, কিন্তু তাঁর বাবাও আক্রান্ত হয়েছেন। ডাকাতির উদ্দেশ্যে বা এ রকম কিছুও হতে পারে। আমরা অপেক্ষা করছি, অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখছি। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আশা করি জট খুলবে এবং আমরা অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঞা ও পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য, জেলা প্রশাসক মাহামুদুল আলম, পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন, র‌্যাব-১৩ প্রধানসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বিকেলে বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঞা ও পুলিশের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউএনওর কক্ষের সিসিটিভি ফুটেজে দুজন মানুষকে দেখতে পেয়েছি। তারা একজন পিপিই ও একজন কালো পোশাক-মাস্ক পরে ছিল। আমরা তাদের চিনতে পারিনি। দুর্বৃত্তরা সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করেছে। এখনো মামলা হয়নি। নৈশপ্রহরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’ প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘বাসা থেকে কোনো কিছু খোয়া যাওয়ার আলামত পাওয়া যায়নি। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি।’

প্রত্যক্ষদর্শী বাবার বর্ণনা : রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়াহিদা খানমের বাবা ওমর আলী গতকাল বিকেলে জানান, তাঁদের বাড়ি নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলায়। ওয়াহিদার স্বামীর বাড়ি রাজশাহীতে। নওগাঁ থেকে ওমর আলী মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি মুখে কালো কাপড় দেওয়া একজনকে দেখেছেন। ওমর আলী বলেন, ‘রাত ৩টা-সাড়ে ৩টার দিকে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে কেবল শুয়েছি, ঘুম ঘুম লাগছিল। এমন সময় মেয়ের চিৎকার শুনে ওপরতলায় যাই। গিয়ে দেখি মুখোশধারী এক ব্যক্তি ওর (ওয়াহিদা) কাছে চাবি চাচ্ছিল। টাকা-পয়সা ও গহনা কোথায় জানতে চাচ্ছিল, নইলে আমার নাতিকে মেরে ফেলবে। একপর্যায়ে তার সঙ্গে আমার ধস্তাধস্তি হয়। ওই লোক হাতুড়ি দিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করলে আমি মেঝেতে পড়ে যাই। তারপর আর কিছু আমি বলতে পারি না।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তি পূর্বের কোনো আক্রোশ বা তেমন কোনো কথা বলে নাই। মুখোশ পরা ছিল বলে চিনতে পারি নাই।’

ওমর আলী ভাষ্য মতে, ভবনের পশ্চিম পাশের দ্বিতীয় তলার বাথরুমের ভেন্টিলেটরের থাই গ্লাস ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল হামলাকারীরা। তারা আলমারি খুলে একটি ল্যাপটপ নিয়ে যায়। ওই সময় তাঁর নাতি (ওয়াহিদার ছেলে) বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। তিনি চিৎকার করলে নৈশপ্রহরী পলাশ ওপরে দৌড়ে উঠতে গিয়ে দেখেন, কেচি গেটের ওপর ও নিচে তালা মেরে দেওয়া হয়েছে। পরে আশপাশের কোয়ার্টারের লোকজনও আসে। কোয়ার্টারের বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেয়।

ওয়াহিদা খানমের স্বামী মেজবাউল হোসেন বলেন, ‘ঘটনার পর দ্রুত মুমূর্ষু ওয়াহিদাকে রংপুর কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মাথার হাড় দেবে গেছে এবং শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে। পরে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘ইউএনওর মাথায় আঘাতের কারণে হাড় ভেঙে সেটা ব্রেনে ঢুকে গেছে। এক পাশ অবশ হয়ে আছে। আমরা রাতেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচার শেষে ওয়াহিদা খানমকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

তদন্তকারীরা যা বলছেন: দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম জানান, দুর্বৃত্তরা ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে ইউএনওর বাবাকে আহত করে পাশের ঘরে আটকে রাখে। পরে ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি তাঁকেও কুপিয়ে পালিয়ে যায়। মূলত ওয়াহিদা খানমকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা জেলা প্রশাসকের।

ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম বলেন, ঠিক কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি। বাড়ির পেছনে ভেন্টিলেটর ভেঙে দুর্বৃত্তরা ঘরে প্রবেশ করে। এই কাজে তারা একটি মই ব্যবহার করে। বাড়ির পেছনে মইটি পাওয়া গেছে।’

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, ওয়াহিদা খানমের বাসার সিসি ক্যামেরায় দুজনকে ঢুকতে দেখা গেলেও বের হতে দেখা গেছে একজনকে। তারা দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে। এসব কারণে রহস্য আছে। প্রথমে ইউএনও ওয়াহিদাকে জিম্মি করতে চায় হামলাকারীরা। তাঁর বাবা বাধা দেওয়ায় প্রথমে তাঁর ওপর হামলা করা হয়। শিশুসন্তান অক্ষতই আছে। বাসা থেকে তেমন কিছু খোয়া যায়নি। ওয়াহিদার বাবা বলেন, তাঁর ওপর হামলার পর তিনি মেয়েকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন।

সূত্র মতে, ইউএনও ওয়াহিদা এক মাস আগে করতোয়া নদীতে বালু ড্রেজার উচ্ছেদ অভিযান চালান। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। ঘোড়াঘাট উপজেলায় জঙ্গি সংগঠনের অপতৎপরতা আছে। গুলশানের হলি আর্টিজান হামলা এবং শোলাকিয়ার ঈদগাহে হামলার ঘটনায় এইউপজেলার কজন জঙ্গির সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। র‌্যাব-১৩-র অধিনায়ক রেজা আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করছি আমরা।’

তীব্র নিন্দা ও বিচার দাবি করেছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন : ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন ওই হামলার ঘটনার যথাযথ কারণ অনুসন্ধান করে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচারের জোর দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সমন্বয়কারী হিসেবে ইউএনওরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একজন ইউএনওর ওপর এমন পাশবিক ও নির্মম হামলা খুবই দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।

জানা গেছে, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছে।

সূত্র: অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *