জাবির উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ তিন দফা দাবিতে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এই ব্যানারে কর্মসূচি পালিত হয়। দাবি আদায় না হওয়ায় বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) ও বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তারা।

মঙ্গলবার দিনভর অবরোধে স্থবির ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এ দিন কার্যালয়ে আসেননি।

এদিকে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যরা।

দুর্নীতির অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড ক্যাটাগরির ১৯ জন সিনেট সদস্য বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘মেগা প্রকল্প সম্পর্কে সিন্ডিকেট ও সিনেট সভায় উপস্থাপন করা হয়নি এবং তাদের কোনও মতামত নেওয়া হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান করার সময় যথাযথ ধাপ অনুসরণ করা হয়নি এবং অংশীজনের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি।’

তারা অভিযোগ করেন, ‘মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের কারও এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের যোগ্যতা নেই। উপাচার্য তার ব্যক্তিগত সচিবসহ অনুগত ও অদক্ষ ব্যক্তিদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে রেখেছেন। অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আর্কিটেক্ট ফার্ম নির্বাচন করেছেন তিনি।’
ই-টেন্ডার না করার কারণে টেন্ডার ছিনতাই হওয়ার ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। সব অভিযোগের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন এই ১৯ সিনেট সদস্য।

এদিকে, সংবাদ সম্মেলন করে দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অ্যাখ্যা দিয়েছেন সিনেট সদস্যদের আরেকটি পক্ষ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সিনেট সদস্য অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার বলেন, ‘ঠিকাদার তাদের কাজ শেষে পর্যাক্রমে বিল জমা দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড়ের পরই কেবল যথাযথ নিরীক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিল পরিশোধ হয়। কিন্তু যেখানে কাজ শুরুই হয়নি, সেখানে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অযৌক্তিক।’
উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের জন্য গত বছরের ২৩ অক্টোবর এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের জন্য গত ১ মে টেন্ডার আহ্বান করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হলগুলো নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
নির্মিতব্য হলগুলোর জন্য নির্বাচিত স্থানগুলোতে ১১শ’র বেশি গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি গাছ কাটা পড়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে যে মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করা হচ্ছে, তা অপরিকল্পিত-অস্বচ্ছ।
প্রকল্পে দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত, তিনটি ছাত্র হলের বিকল্প স্থান নির্বাচন এবং অস্বচ্ছতা দূর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এর ব্যানারে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ।
দিনভর অবরোধ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘তিনটি ছাত্র হলের জন্য এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে যেখানে গাছ কম কাটা পড়বে। আর অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ভাগাভাগির যে অভিযোগ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা মিথ্যা দাবি করছে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোনও উচ্চতর কমিটির মাধ্যমে এই অভিযোগের তদন্ত হতে হবে। সেটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কিংবা ইউজিসির তদন্ত হতে পারে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর মাস্টারপ্ল্যানের সব শর্ত পূরণ করে তা পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ.স. ম. ফিরোজ- উল- হাসান বলেন, ‘সরকার এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য। আমরা শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানিয়ে আসছি, তারা যেন আন্দোলন ছেড়ে যৌক্তিক জায়গা থেকে উন্নয়নের সঙ্গে একমত হয়। আন্দোলন এখন যৌক্তিক জায়গা থেকে সরে রাজনীতির জায়গায় চলে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন কারও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার না হয় সেটি তাদের বোঝা উচিত। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সবার সহযোগিতা দরকার।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *