গণহত্যাকারী: ভেজাল-নকলের ব্যবসায়ীরা

তুষার আবদুল্লাহ

হত্যার খবর প্রতিদিনই গণমাধ্যমে আসে। হত্যাকারী চিহ্নিত হয় তাৎক্ষণিকভাবে অথবা তদন্তে মূল হত্যাকারীর নাম বেরিয়ে আসে। শাস্তির আওতায় সব হত্যাকারীকেই নিয়ে আসা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিলম্ব হলেও হত্যাকারী এবং পরিকল্পনাকারীরা রেহাই পান না। একাত্তরে যারা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সরাসরি বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে তারাও রেহাই পায়নি। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বাইরে পরিবার ও সামাজিক হত্যাকারীরাও শাস্তি বা বিচারের অধীনে এসেছে। তারপরও ব্যক্তি, সামাজিক শত্রুতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের হত্যাকাণ্ড নির্মূল করা যায়নি। হত্যার আরও নানা রকমফের তৈরি হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই। ধর্মীয় বিরোধ ও হিংসার হত্যাও থামানো যায়নি, বরং বাড়তির দিকে। এ ধরনের হত্যা তো দৃশ্যমান। অদৃশ্য বা ধীরে ধীরে হত্যা করার প্রক্রিয়াও তো চলমান। শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি প্রজন্ম বা জনগোষ্ঠীকে হত্যা করায় সক্রিয় রয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই পক্ষগুলোর একটি হচ্ছে বেনিয়া গোষ্ঠী। সারা পৃথিবীতেই এরা নীরব ঘাতকের কাজ করে। মাদকের মাধ্যমে, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় এবং সাদা চিনির মাধ্যমে অসংক্রামক অনেক রোগের বীজ বুনে দিচ্ছে এই বেনিয়ারা। বাংলাদেশ এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয়। তবে বাংলাদেশ ও অন্যান্য, বিশেষ করে উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে তফাৎ হলো– সেখানে রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ক্রেতা সংগঠনের সক্রিয়তার জন্য সেখানে খাবারে ভেজাল ও নকলের প্রবণতা নেই বললেই চলে।

সম্প্রতি বিএসটিআই’র দেওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, নামি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ব্যাপক বিজ্ঞাপায়িত পণ্যের মানও সন্তোষজনক তো নয়ই বরং স্বাস্থ্যের জন্যে বিপজ্জনক। বিজ্ঞাপন দেখে বা শিল্পগোষ্ঠী তথাকথিত সুনাম দেখে ক্রেতারা পণ্য কিনে শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, একই সঙ্গে তারা পকেটের টাকা দিয়ে দুরারোগ্য ব্যাধি কিনে নিচ্ছেন। শিল্পগোষ্ঠীর পণ্যের মানেরই যখন এই হাল তখন ফুটপাতের সাধারণ খাবার বা পণ্যের কী হাল হতে পারে? কাপড় বা দেয়ালের রঙ দিয়ে জুস, খেজুর চকচক করে তোলার জন্য রঙ মাখিয়ে বিক্রি করা। সুপারশপে পচা মাছ, বাসি খাবার বিক্রি, রেস্টুরেন্টের নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি ও বিক্রি, এই অভিযোগের বাইরে কয়টি দোকান বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী আছে? উত্তর দেওয়া মুশকিল। এই যে বেনিয়া গোষ্ঠী নীরব ঘাতক হয়ে উঠলো, তা-তো একরাত্রিতে হয়নি। ধীরে ধীরে তারা এই সাহস সঞ্চয় করেছে। বিএসটিআই এখন ভেজাল ও নিম্নমানের তালিকা যে ঝুলিয়ে দিলো বা জানালো, এই ভূমিকা নেওয়ার নৈতিক অধিকার কি প্রতিষ্ঠানটির আছে? ঘুষের বিনিময়ে পণ্যের ‘মান’ সনদ দেওয়ার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আছে। সনদ দেওয়ার পর বাজারে কতটা তদারকি বজায় রাখে তারা? পণ্যকে নিম্নমানের বলে চিহ্নিত করার পর তারা কি বাজার থেকে ওই পণ্য তুলে নেওয়ার কোনও নির্দেশনা দিয়েছে অভিযুক্ত উৎপাদককে? এমন নির্দেশনার কথা শোনা যায়নি। ফলে ওই পণ্যগুলো বিপণিগুলোতে এখনও বিক্রি হচ্ছে ক্রেতারা জেনে না জেনে ওই পণ্য কিনছেন। সিটি করপোরেশন ভেজাল নকলের বিরুদ্ধে অভিযান বা যুদ্ধে নেমেছে। তাদের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা যদি নিয়মিত হোটেল রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করতেন, তাহলে পরিস্থিতি এতটা বিপর্যয়কর অবস্থায় পৌঁছাতো না। তারা পরিদর্শন করেন না এমন বলা যাবে না। তারা একটি বিনিময় চুক্তির আওতায় আছেন। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিও তাদের ছাড়পত্র পেয়ে যায়।

‘দুর্নীতি’কে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করায় আমাদের রাষ্ট্রীয় সংগঠন বা দফতরগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বেনিয়া গোষ্ঠী বলি বা অন্য সাধারণ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের কথাই বলি কেউই এসব দফতরের প্রশ্রয় ছাড়া কোনও অনিয়ম বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয়। মাফ পাওয়া যাবে এমন একটি সবুজ সংকেতকে সামনে রেখেই বড় শিল্পগোষ্ঠী তাদের বাজারে কাটতি থাকা পণ্যে ভেজাল দিচ্ছে, আবার ছোট ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার লোভে খাবারে ভেজাল দিচ্ছে অথবা নকল পণ্য তৈরি করছে। এদের সবার মুনাফার একটি অংশ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা পাচ্ছেন। উচ্চ আদালত যথাযথই বলেছেন এই নকল ভেজাল প্রতিরোধে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যে ব্যর্থতা একটি জাতিকে রোগাক্রান্ত জাতিতে পরিণত করেছে। শিশু থেকে প্রবীণ সবাই আমরা দুরারোগ্য নানা জটিল পরিচিত ও অপরিচিত রোগের ঝুঁকিতে আছি। আক্রান্তের সংখ্যাও কম নয়, যা আচমকা মৃত্যুর কারণও হয়ে উঠছে। এই যে হত্যা, গণহত্যা। এই হত্যাকারীরা তো এখন চিহ্নিতই। তাদের কি শাস্তির আওতায় আনা যাবে না,আনা কি খুবই কঠিন? ভেজাল-নকল খাবার ও পণ্যের অস্ত্র দিয়ে যারা মানব নিধনে নেমেছে তারা কতিপয় বেনিয়া গোষ্ঠী মাত্র। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সোচ্চার হওয়া কি খুব দুঃসাহসিক কাজ?  উত্তর রয়েছে রাষ্ট্রের কাছেই। আমরা সাধারণ নাগরিকরা শুধু এই নীরব ঘাতকদের কাছ থেকে মুক্তি চাই। চাই তাদের শাস্তি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

সৌজন্যেঃঃ বাংলাট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *