ক্যাপাসিটি চার্জ না বিদ্যুৎ বিল মওকুফ চাইছি

রুমিন ফারহানা

আঘাত এসেছে জীবনের ওপর, আঘাত এসেছে জীবিকার ওপর। উন্নত কিংবা ধনী দেশগুলো যেমন তেমন, কিন্তু ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েছে আমাদের মতো দেশগুলো যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্যই দুই বা তিনদিন জীবিকা বন্ধ থাকা অনেকটাই জীবনের দ্বার রুদ্ধ হওয়ার মতো। ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় থাকতে বাধ্য হওয়া সাধারণ, অসচেতন মানুষ কেবল যে নিজের বা পরিবারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে তাই নয় বরং তার চারপাশ এবং তাদের সংস্পর্শে যারাই আসে তাদের সকলের জন্যই একটি বড় ঝুঁকির ক্ষেত্র অবধারিতভাবেই তৈরি হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই সব দেশের সরকারই চেয়েছে মানুষ যেন ঘরে থাকে। জীবন আর জীবিকার এই টানাপোড়েনে ধনী, দরিদ্র, উন্নত, অনুন্নত প্রায় সব দেশের সরকারই তাই বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ, ত্রাণ বা সহযোগিতা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। তারই অংশ হিসাবে সরকারের তরফে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে লেট ফি বা বিলম্ব মাশুল মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। পরিষ্কার বলা ভালো এটি বিল মওকুফ নয়। সময় মতো বিল পরিশোধ না করলে যে বাড়তি কয়টি টাকা গ্রাহককে গুনতে হয় সেটি মওকুফ। কয়েক হাজার টাকা বিলের ভিড়ে সেটির পরিমাণ কয়েকশ টাকার বেশি নয়। বরং দুই বা তিন মাসের বিল একত্রিত হয়ে যখন তা গ্রাহকের হাতে পৌঁছায় তখন বেশিরভাগ গ্রাহকেরই ভিড়মি খাবার যোগাড় হয়। যেমনটি আমার ক্ষেত্রে হয়েছে।  

আমার বাসায় অদ্ভুতুড়ে বিল নতুন কিছু না। প্রতিবার দৌড়ে গিয়ে অভিযোগ দাখিল করি, পরের তিন চার মাস বিল তুলনামূলক কম আসে, আবার যেই কে সেই।  গত ১০ বছরে ৮ বার খুচরা পর্যায়ে বাড়লো বিদ্যুতের দাম। এই দাম বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ঋণ খেলাপি, শেয়ার মার্কেট লুটেরা, বিদেশে টাকা পাচারকারী, মাদক আর ইয়াবা ব্যবসায়ী, ক্যাসিনো কাণ্ডের নির্মাতা, টেন্ডার আর চাঁদাবাজির বাজিকর, সরকার আর সরকার দলীয় সুবিধাভোগী, ভিআইপি কিংবা ভিভিআইপি’দের জন্য কোনও সমস্যা না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ যে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষ যাদের এক দিকের খরচ বাড়লে টান পড়ে শতদিকে তাদের জন্য এক বড় দুঃসংবাদ বৈকি। অবশ্য ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদের এই সময় তাদের কথা বলার বা ভাববার কথা সরকারের নয়। সরকার তাই ভাবেওনি তাদের কথা। যে দেশে গত ১০ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখের বেশি, ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ আছে এমন লোক বৃদ্ধিতে যে দেশ বিশ্বে প্রথম, ৮ থেকে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ আছে এমন লোক বৃদ্ধিতে যে দেশ বিশ্বে তৃতীয়, সেই দেশেরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১০ কোটির কিছু বেশি হলেও তাদের মধ্যে ৭ কোটি মানুষের অ্যাকাউন্টেই গড়ে আছে মাত্র ৬১০ টাকা। গড় মাথাপিছু আয় যেখানে ১ হাজার ৯০০ ডলার অর্থাৎ মাসিক মাথাপিছু আয় ১৩ হাজার টাকা সেখানে এ কি তাজ্জব হিসাব? শুভঙ্করের ফাঁকি আর কাকে বলে! বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুর‍্যোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৭ অনুযায়ী দেশের যে ৮৫ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন যার সংখ্যা ৬ কোটি ৮ লাখের মত তার মধ্যে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৪ হাজার মানুষেরই নেই কোনও নিশ্চয়তা। তাদের কারো হাতে তেমন সঞ্চয় নেই যা দিয়ে কয়েক দিন বসে খাওয়া যায়। তাদের প্রতিটা টাকা হিসাবের যার এক অংক বাড়লেও মাশুল দিতে হয় কয়েকগুণ।  

দেশে গত ১০ বছরে বিভিন্ন খাতে যে দুর্নীতি চলেছে তার মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার নয়ছয় হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। চাহিদা নেই তবু নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অলস পড়ে আছে অর্ধেকের বেশি, ক্যাপাসিটি চার্জ আর ভর্তুকি দুইই চলছে সমান গতিতে। সমস্যা কী?

গত এক দশকে বিদ্যুৎসহ গোটা জ্বালানিখাতে ক্রমাগত দুর্নীতি আর লুটপাটের যে ধারা চলেছে তার মাশুল আমরা দিচ্ছি এবং দিতে হবে ভবিষ্যতেও। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুতের ঘাটতি দেখিয়ে সরকার আপদকালীন স্বল্প মেয়াদে ২-৩ বছর তেল ভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয়। বলা হয়েছিল এরপর কয়লা এবং গ্যাস ভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। সচেতন মানুষ অবশ্য সরকারের এ কথা বিশ্বাস করেনি, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই কেন্দ্রগুলো স্থাপন করার আগে সরকার ইনডেমনিটি দেয় যা পূর্বাভাস দিয়েছিল এই খাতে কী ঘটতে যাচ্ছে। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো, একের পর এক নতুন কুইক রেন্টাল স্থাপন, সরকারের ঘনিষ্ঠজনদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া সবই হয়েছে একের পর এক। ছোট্ট একটি হিসাব বিষয়টিকে স্পষ্ট করবে। গত বছর সরকার সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে শুধু ভাড়া হিসাবেই দিয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা এ বছর হবে ২০ হাজার কোটি টাকা যেখানে গত বছর ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে না হলে ভর্তুকি দূরের কথা এই খাতে উদ্বৃত্ত থাকতো অনেক টাকা।

করোনা তার কালো থাবা বসায়নি এমন কোনও খাত নেই। জ্বালানি খাতও এর বাইরে নয়। ইতিমধ্যেই জানা গেছে করোনার কারণে ৩ মাসে (এপ্রিল – জুন) বিদ্যুৎ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার ২২০ কোটি টাকা। করোনাকাল দীর্ঘ হয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত গেলে নয় মাসে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চাহিদা হ্রাসের কারণে বিদ্যুৎ বিক্রি কম হওয়া, বন্ধ থাকার পরও রেন্টাল চার্জ প্রদান, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধিসহ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন খাতে এই লোকসান গুনতে হবে বিদ্যুৎ বিভাগকে। এই ক্ষতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকি বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আপাতত বিনা সুদে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছেন তারা।  

কিন্তু ঋণ, ভর্তুকি, বিদ্যুতের মূল্য কিংবা লোকসান যাই বলি না কেন সবই দিনের শেষে পরিশোধিত হবে জনগণের টাকায়।  মোটা দাগে সরকারের আয়ের উৎস হলো প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর। আর এই করের উৎস হলো জনগণ। নানামুখী চাপে মানুষের দুর্ভোগ এখন সীমাহীন। বেশিরভাগ মানুষই তাদের ন্যূনতম চাহিদা বা বেসিক নিড পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে যে ৮৫ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতের সাথে জড়িত তাদের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গিন। চাকরি হারিয়েছেন অনেকে, অনেককে মূল বেতনের ৫০ বা ৬০ শতাংশ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। এর মধ্যেই আছে বাজার খরচ, বাড়ি ভাড়া, পরিবহণ ব্যয়, বাচ্চাদের স্কুলের বেতনসহ আনুসাঙ্গিক নানা খরচ। অনেকেই দাবি তুলেছেন বাড়ি ভাড়া মওকুফের। অনেক বাড়িওয়ালা তা করেছেনও। সরকারের উচিত হবে এই কয়েক মাসের বিদ্যুৎ বিলের বিলম্ব ফি’র যৎসামান্য কিছু টাকা মওকুফ না করে বরং বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করা। সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। আবাসিক ভবনের বিদ্যুৎ বিল মওকুফ হতে পারে সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় ধরনের প্রণোদনা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যদি কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বছর বছর হাজার কোটি টাকা দেওয়া যায় তাহলে এই দুঃসময়ে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে মাত্র কয়েক মাসের বিদ্যুৎ বিল মওকুফ নয় কেন?

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

সৌজন্যে: বাংলাট্রিবিউন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *