করোনা মোকাবেলায় গার্মেন্ট শিল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলায় আজ রবিবার শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। অপরদিকে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ নেতারা বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মিলিত হয়ে সংকট মোকাবেলায় আর্থিক প্রণোদনার বিষয়ে আলোচনা করবে। এরপর কাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সামগ্রিক বিষয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হবে মন্ত্রিসভা।

ওই বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী যেসব সিদ্ধান্ত দেবেন সেগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পোশাক খাতের চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় শনিবার বিকালে রাজধানীর শ্রম ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। বৈঠকে উপস্থিত বেশির ভাগ নেতা বিদ্যমান সংকট মোকাবেলায় সরকারের কাছে বিশেষ তহবিল চান, যা প্রণোদনা হিসেবে দিতে হবে। তারা বলেন, ওই সংকট মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে প্যাকেজ ফান্ড ঘোষণা করছে। তাই এখানেও করতে হবে। এজন্য কেউ কেউ এ মুহূর্তে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণার জোর দাবি জানান। তারা আরও বলেন, সংকটকালীন মুহূর্তে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

গার্মেন্ট খাতের সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে দেড় ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন, শ্রম সচিব কেএম আলী আজম, বিকেএমইএ সভাপতি ও সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান, বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী, এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক ও একই সংগঠনের সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম পারভেজ, বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মন্টু প্রমুখ।

সভায় মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, মিল-কারখানা বন্ধ করতে হবে সেটা যেন কারও মাথায় না ঢোকে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না। সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, করোনার মহামারী মোকাবেলায় আইএলওসহ শ্রমিক নেতাদের ডেকে তাদের পরামর্শ নেয়া হবে। এ পরিস্থিতিতে মালিক-শ্রমিক উভয়কেই উতরাতে হবে। কারণ দুই ঈদের বোনাসসহ বেতন শ্রমিকদের দিতে হবে। আবার মালিকরা কে কী অবস্থায় আছে সেটাও ভাবতে হবে।

সভায় কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতরের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে উৎপাদন বা কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রম অসন্তোষ হতে পারে। আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকায় ৮২টি এবং চট্টগ্রামে ১৫টি এ জাতীয় ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা আছে।

সেলিম ওসমান বলেন, বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করায় গার্মেন্ট মালিকরা আতঙ্কিত। অর্ডার বাতিল ছাড়াও অনেকে তৈরিকৃত মাল শিপমেন্ট করতে বারণ করছেন। এ অবস্থায় শিল্পের একমাত্র সম্পদ শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শিপমেন্ট শুরু হলে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কারখানা মালিকদের কারখানা বন্ধের চিন্তা করা ঠিক হবে না। সরকারের সহযোগিতায় এই সংকট মোকাবেলা করা যাবে।

ড. রুবানা হক বলেন, এখন পর্যন্ত ২১৬টি কারখানা ৫০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ হারিয়েছে। ক্রেতারা এখন পণ্য না নিয়ে পরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থায় শ্রমিকদের বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। কারখানা বন্ধ করার সক্ষমতা অনেকের নেই। তিনি আরও বলেন, আগে ক্রেতারা শ্রমিকদের মানবাধিকারের কথা বলত। এখন তারা অর্ডার বাতিল করছে, কিন্তু মানবাধিকারের দিকে তাকাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিন পিরিয়ড আছে, সেটা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

সালাম মুর্শেদী বলেন, অর্থ, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনেক ফান্ড আছে। এছাড়া চলমান প্রণোদনার তহবিলসহ নতুন বাজার সৃষ্টির জন্যও ফান্ড রয়েছে। তিনি মনে করেন, এই সংকট মোকাবেলায় এসব ফান্ড দ্রুত রিলিজ করতে হবে। পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় আলাদা বরাদ্দ দিলে গার্মেন্ট মালিকরা ওই সংকট উতরাতে পারবে।

আনোয়ার উল আলম পারভেজ বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার থেকে ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছে। এ অবস্থায় গার্মেন্ট মালিকরা বেতন দেবে কীভাবে? টাকা আসবে কোত্থেকে? ইতোমধ্যে কম্বোডিয়া ও রেঙ্গুনে বেতন না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কালও যদি করোনা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়, তাহলেও ৬ মাস গার্মেন্টে সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। এ অবস্থায় সরকার ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে।’

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আতঙ্ক ছড়িয়ে কারখানা বন্ধ করে দিলে প্রান্তিক শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারখানা বন্ধ কোনো সমাধান হতে পারে না। সরকার মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে শিল্প খাতে সেই টাকা বরাদ্দ দিলে শিল্প বেঁচে থাকবে।’

সভা শেষে সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করেন এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান, সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী ও বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেলিম ওসমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে কারখানা বন্ধ করা দরকার কিনা সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আজ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কারখানা চলবে। তারপরও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেসব ফ্যাক্টরি বিপদগ্রস্ত, অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব কারখানার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আগামীকাল আরেকটি বৈঠক করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন অনেক গার্মেন্ট মালিক আতঙ্কিত। ভবিষ্যতে কী হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সরকারের সহযোগিতা নিয়ে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেয়া হবে।’

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘সভায় একটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে, কারখানার চাকা চলবে শ্রমিকের জন্য। যতক্ষণ আমরা চালিয়ে রাখতে পারি। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *