আমরা কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবো?

রুমিন ফারহানা

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় সব সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা হয় বলে আমাদের দেশের মতো সারা বছর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় না–এই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ শিক্ষাটা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন আমাদের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা। যদিও তারা উগান্ডা গিয়েছিলেন পানি পরিশোধন নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে। এটি নিয়ে সঙ্গত কারণেই দেশে বেশ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হয়েছিল। নেটিজেনরা জানেন, উগান্ডা নিয়ে আমাদের বিদ্রূপ অবশ্য চলছে এর অনেক দিন আগে থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের বাঘাবাঘা ক্ষমতাবানদের নিয়ে নানা বিদ্রূপের সময় অনেকেই লেখেন–উগান্ডার…বলেছেন।
‘উন্নয়ন’-এর গগণবিদারি প্রপাগান্ডা শুনতে শুনতে আমরা ধরেই নেই, সাব-সাহারান আফ্রিকা মানেই যাচ্ছেতাই দেশ। সত্যিই কি তাই? এই উগান্ডার গণতন্ত্রের অবস্থা তো আমাদের চেয়ে খারাপ নয়–ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের র‍্যাংকিং-এ তারাও আমাদের মতো ‘হাইব্রিড রেজিম’-এ আছে। বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো করেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে (যদিও এটা ভ্রান্ত) বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা যাবতীয় অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি উগান্ডার চাইতে ৪০ শতাংশ কম। বাংলাদেশের প্রায় তিন ভাগের একভাগ মাথাপিছু আয় উগান্ডার, কিন্তু জাতিসংঘের মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের তুলনায় দেশটির স্কোর ৭০ শতাংশ, এবং তাদের চরম দারিদ্র্যের হার আমাদের চেয়ে মাত্র ২৫ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী উগান্ডায় বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু এই আলোচনা শেষ করছি, আমাদের আরেকটি আলোচিত বিষয় দিয়ে। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালগুলোর র‍্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও যখন ১০০০-এর মধ্যে থাকে না, তখন উগান্ডার ম্যাকাইরা ইউনিভার্সিটির র‍্যাংকিং ৬০০ থেকে ৮০০ এর মধ্যে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এই বছর শান্তিতে নোবেল পাওয়ায় আলোকিত মুখ নিয়ে ইথিওপিয়া বিশ্ববাসীর সামনে আসলেও এর আগে ইথিওপিয়া আমাদের সামনে ছিল দুর্ভিক্ষ আর গৃহযুদ্ধ বিপর্যস্ত একটি দেশ হিসেবে। তাই ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্ট ফর পিস অ্যান্ড টলারেন্সের নেক্সট ভেন্যু যখন আর্জেন্টিনার পর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা নির্ধারিত হয়, তখন এর সদস্য হিসেবে কিছুটা যে আতঙ্কিত হইনি, তা হলফ করে বলা যাবে না।

বিমানের টিকিট দিয়েছে আয়োজকরা। সুতরাং ক্যারিয়ার চয়েসেও আমার কোনও হাত ছিল না। তাই ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাস টিকিট থাকার পরও আমি কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিলাম। আমার রুট ছিল ঢাকা-ব্যাংকক-আদ্দিস আবাবা।

ব্যাংকক পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান, এরপর ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স। ফেরার সময়ও এই রুট। এর আগে অনেক বিদেশ যাত্রায় বাংলাদেশ বিমানে শুরুর একটা অংশ যাওয়ার পর যখন অন্য এয়ারলাইন্সে বাকি যাত্রার কথা থাকতো, তখন পরে যে এয়ারলাইন্সই থাকতো না কেন, আমি চোখ বুজে নিশ্চিন্তে থাকতাম যাত্রার বাকি পথটা আমার ভ্রমণ আনন্দময় হবে। কিন্তু এই প্রথম এর ব্যত্যয় হলো, আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলাম আমার ব্যাংকক-আদ্দিস আবাবা ভ্রমণ নিয়ে।

যেহেতু বিমানের পর পরই ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স তাই আমার চোখে দুই দেশের ন্যাশনাল এয়ারক্রাফটের পার্থক্যটা তীরের মতো বিঁধেছে। আসন দুই ইঞ্চি বড় আর বাসি কেকের টুকরো একটা বেশি, এর বাইরে বাংলাদেশ বিমানের বিজনেস আর ইকোনমি ক্লাসের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাসের সিট সুপরিসর। তাদের খাবার অসাধারণ। বিজনেস ক্লাসে ‘ফাইন ডাইন’ বাংলাদেশ বিমান কবে কল্পনা করবে জানি না, কিন্তু ইথিওপিয়া সেটা দেয়। মেইন কোর্সে ছিল নানা রকম অপশন—ফ্রেস সালাদ, ডেজার্টও ছিল কয়েক পদের। দুই এয়ারলাইন্সে কেবিন ক্রুদের এপিয়ারেন্স, স্মার্টনেস, প্রফেশনালিজম, ব্যবহারের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। হাসিমুখে আন্তরিক সেবা কীভাবে দিতে হয়, সেই ন্যূনতম জ্ঞান কি আমাদের কেবিন ক্রুদের আছে? থাকলেও সেই ইচ্ছে কি আছে তাদের?

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের এই সেবা মোটেও নতুন বিষয় নয়, কিন্তু দীর্ঘদিনের বিদেশে আসা-যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এমন সব সেবা পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় সব এয়ারলাইন্সে এমনিতেই পাওয়া যায়। আমি বলছি না, এই এয়ারলাইন্সের সেবার মান একেবারে এমিরেটসের পর্যায়ে চলে গেছে, তবে আমি এটা বলছি, তারা নেতৃস্থানীয় এয়ারলাইন্সের কাছাকাছি গেছে এবং তাদের চোখে-মুখে এবং শরীরী ভাষায় উন্নতির স্পৃহা দেখতে পেয়েছি। সে তুলনায় আমাদের আর সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিমানেও দেখেছি জাস্ট দায়সারা ভাব।

এরপর যখন আদ্দিস আবাবার বোল এয়ারপোর্টে নামলাম, সেটা তখন আমার জন্য আরেক বিস্ময় হিসেবে উপস্থিত হলো। এটি এক চমৎকার, সুপরিসর বিমানবন্দর। জানলাম এই এয়ারপোর্ট একটা আঞ্চলিক হাব হওয়ার পরিকল্পনায় তাদের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে, এবং নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। শুধু সুপরিসরই নয়, অসাধারণ পরিচ্ছন্ন একটি বিমানবন্দর এটি। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়লো ঢাকার বিমানবন্দরের অপরিচ্ছন্নতার কথা, ঘিঞ্জি অবস্থার কথা এবং যা না বললেই নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে মশার কথা। এয়ারপোর্টের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর সেবার মান তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। বোল এয়ারপোর্টের কর্মীদের আন্তরিক সেবা আমাকে অবাক করেছে। লাগেজ পেয়ে গিয়েছিলাম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, যা ঢাকায় কল্পনাও করা যায় না। একবার তো লাগেজ পেতে ঢাকায় ২ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল আমার। আমি পৌছেঁছিলাম ভোর ৪ টায়। আয়োজকদের কিছুটা দেরি হয়েছিল আসতে। সেই সময়টুকুতে এয়ারপোর্ট অথরিটির যে আন্তরিকতা, সাহায্যের মানসিকতা দেখেছি, তা কখনোই ভোলার নয়। পাঠক একটা বিষয় একটু লক্ষ করবেন, আমরা পশ্চিমের কোনও উন্নত দেশ নিয়ে আলাপ করছি না,  কথা বলছি ইথিওপিয়া নিয়ে, যে দেশটি দারিদ্র্য আর দুর্ভিক্ষের খবর হয়েই বার বার আমাদের সামনে এসেছে।

আমাদের তাচ্ছিল্যের দেশ ইথিওপিয়া, তাই তাদের এয়ারলাইন্স এবং এয়ারপোর্টের এই অবস্থা দেখে এসে অবাক হয়ে কিছু তথ্য খোঁজার চেষ্টা করলাম। দেখলাম আর অবাক হলাম। বিমানের সংখ্যায় (১১৭টি), গন্তব্যের সংখ্যায় (যাত্রীর ক্ষেত্রে ১২৫, কার্গোর ক্ষেত্রে ৪৪) এবং পরিবহন করা যাত্রীর সংখ্যায় ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স আফ্রিকার সর্ববৃহৎ এয়ারলাইন আর এটা সেবা দেওয়া দেশের সংখ্যায় পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ এয়ারলাইন্স। গত অর্থ বছরে এই এয়ারলাইন্স প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে ৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে।

আমাদের বিমানের শুধু একটি তথ্যই দেখি, গত বছরের রাজস্ব ছিলো ৫,৭৯১ কোটি টাকা আর লাভ করেছে ২৭২ কোটি টাকা। এই তথ্যও জরুরি, বিমান লাভ করে কদাচিৎ, লোকসান করাই বিমানের ‘ট্রেডমার্ক’; যেমন এর আগের অর্থ বছরেই বিমান ২০১ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।  

আমাদের বিমান সংস্থা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। অনেকে বলেন রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকাই এর লোকসানের কারণ। এই কথাও যৌক্তিক নয়, কারণ ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা। চেষ্টা থাকলে, আন্তরিকতা থাকলে সর্বোপরি যাচ্ছেতাই লুটপাট না করলে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাও এত ভালো করতে পারে, এতটা লাভ করতে পারে। ইথিওপিয়ার জিডিপি বাংলাদেশের অর্ধেক, কিন্তু তাদের বিমান সংস্থার সাফল্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এই সত্য দেখিয়ে দেয়। 

তথ্য প্রযুক্তির এই চরমতম পসারের যুগেও নানা কারণে পৃথিবীতে কোনও দেশ সম্পর্কে মানুষের নানা ভুল ধারণা থাকতে পারে। সেই দেশের নানা কিছুর সংস্পর্শে সেই ধারণা পাল্টে যেতে পারে। বাংলাদেশ সম্পর্কে কেউ ভালো কোনও ধারণা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থায় চড়ে বাংলাদেশে রওয়ানা হলে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারণা উলটোপথে যাত্রা শুরু করবে। এরপর বিমানবন্দরের সার্বিক অব্যবস্থাপনা  বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারণা একেবারে উল্টে দেবে।

জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ তার ‘আদর্শ ছেলে’ পদ্যে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’ আফসোস। আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি। কথা বলায় সমস্যা কিছু ছিল না কিছু কাজ অন্তত যদি করতাম। কর্তাব্যক্তিরা দাবি করেন, বিশ্বের তাবৎ মোড়ল রাষ্ট্র নাকি চুপে চুপে বাংলাদেশের উন্নয়নের গোপন রহস্য জানতে চায়। এসব উদ্ভট কথা না বলে যদি কাজের কাজ করতাম তাহলে আর যাই হোক অন্তত ইথিওপিয়া দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ হয় না।

স্বীকার করি, আবি আহমেদ নোবেল পাবার আগে ইথিওপিয়া নিয়ে গভীর অনুসন্ধান আমি করিনি। দেশটির সম্পর্কে নানা নেগেটিভ খবর মাথায় থাকার কারণে বেশ সংশয় এবং কিছুটা ভীতি নিয়ে রওয়ানা হয়ে দেশটি সম্পর্কে আমার ধারণা দ্রুতই পাল্টাতে শুরু করে ওদের রাষ্ট্রীয় বিমানে উঠেই। এরপর তাদের বিমানবন্দর আমার ধারণা পাল্টে দিয়েছে অনেকটাই। এরপর সেই দেশের অনেক কিছুই আমার ধারণা পাল্টে দিয়েছে আমূল। সেই গল্প করা যাবে আরেক দিন।

লেখক: সংসদ সদস্য  (সংরক্ষিত আসন – বিএনপি) ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *